ICT-Lab

এক যুগেও পূরণ হয়নি আইসিটি শিক্ষার ঘাটতি

ডিজিটাল যুগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষা আর বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক দক্ষতার অংশ। বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডেটা সায়েন্সের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা গড়ে তোলা প্রতিটি দেশের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশেও “ডিজিটাল বাংলাদেশ” এবং পরবর্তীতে “স্মার্ট বাংলাদেশ” গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে আইসিটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, বিভিন্ন স্কুল-কলেজে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে আইসিটি শিক্ষা শুধু একটি বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীর কর্মজীবন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা হওয়ার ভিত্তি। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, ডেটা অ্যানালিটিক্স, রোবটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি, ক্লাউড কম্পিউটিং কিংবা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিগত দক্ষতা অপরিহার্য। অথচ বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী এখনও কম্পিউটার ব্যবহারের মৌলিক সুযোগ থেকেও বঞ্চিত। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়ছে।

তবে বাস্তবতা ভিন্ন। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আইসিটি শিক্ষা চালু থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষক নেই, পর্যাপ্ত কম্পিউটার নেই, অনেক ল্যাব অচল হয়ে পড়ে আছে, আবার কোথাও বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতায় শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে পাঠ্যবইয়ে আইসিটি থাকলেও বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থী কম্পিউটার হাতে নেওয়ার সুযোগ পর্যন্ত পায় না।

শিক্ষক সংকট –আইসিটি শিক্ষার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা :আইসিটি শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান একজন দক্ষ শিক্ষক। কিন্তু দেশের বহু মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে এখনও স্থায়ী আইসিটি শিক্ষক নেই। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান বা অন্য বিষয়ের শিক্ষক অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে আইসিটি ক্লাস নেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই অথবা দীর্ঘদিন কোনো দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়নি।

আইসিটি এমন একটি বিষয়, যেখানে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। কম্পিউটার পরিচালনা, সফটওয়্যার ব্যবহার, প্রোগ্রামিং, ইন্টারনেট নিরাপত্তা কিংবা ডেটাবেজ ব্যবস্থাপনা শেখাতে ব্যবহারিক দক্ষতা অপরিহার্য। শিক্ষক যদি নিজেই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত না হন, তাহলে শিক্ষার্থীদেরও কার্যকরভাবে শেখানো সম্ভব হয় না।

অনেক শিক্ষক এখনও পুরোনো সিলেবাস ও প্রচলিত পদ্ধতিতে পাঠদান করেন। অথচ প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। আজকের শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ক্লাউড প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। সেই চাহিদা পূরণে শিক্ষক প্রশিক্ষণকে ধারাবাহিক ও যুগোপযোগী করা জরুরি।

কম্পিউটার সংকট ও অচল ল্যাব: দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় কম্পিউটারের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। একটি কম্পিউটার ব্যবহার করতে অনেক সময় ৮ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে বসতে হয়। এতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে-কলমে শেখার সুযোগ কমে যায়।

অনেক প্রতিষ্ঠানে পুরোনো কম্পিউটার বিকল হয়ে বছরের পর বছর পড়ে থাকে। যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে তা মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট থাকে না। কোথাও অপারেটিং সিস্টেম পুরোনো, কোথাও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ইনস্টল করা নেই। ফলে কম্পিউটার ল্যাব থাকলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।

গ্রামীণ এলাকার অনেক স্কুলে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ এবং দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগও বড় সমস্যা। এসব কারণে অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্ট বা ভার্চুয়াল ল্যাব ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।

আইসিটি বিষয়টি মূলত ব্যবহারিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। কম্পিউটার পরিচালনা, অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার, প্রোগ্রামিং, ডেটাবেস, গ্রাফিক্স ডিজাইন বা ইন্টারনেট নিরাপত্তা—এসব কেবল বই পড়ে শেখা সম্ভব নয়।

কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক ক্লাস নিয়মিত হয় না। পরীক্ষার আগে কয়েকটি ক্লাস নিয়ে দায়সারা প্রস্তুতি দেওয়া হয়। অনেক সময় ব্যবহারিক পরীক্ষাও আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে।

এর ফলে শিক্ষার্থীরা ভালো নম্বর পেলেও বাস্তবে একটি সাধারণ ডকুমেন্ট তৈরি, স্প্রেডশিট ব্যবহার বা প্রেজেন্টেশন তৈরির মতো মৌলিক কাজেও আত্মবিশ্বাসী হয় না।

বাংলাদেশের শহরের কিছু নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং দক্ষ শিক্ষক রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা রোবটিক্স, কোডিং, অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কেও প্রাথমিক ধারণা পাচ্ছে।

অন্যদিকে গ্রামীণ অঞ্চলের অনেক বিদ্যালয়ে একটি কার্যকর কম্পিউটার ল্যাবও নেই। কোথাও বিদ্যুৎ সমস্যা, কোথাও শিক্ষক নেই, কোথাও আবার কম্পিউটার থাকলেও ব্যবহার অনিয়মিত।

এই বৈষম্যের কারণে একই জাতীয় পাঠ্যক্রম অনুসরণ করলেও শিক্ষার্থীদের দক্ষতায় বড় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব :আইসিটি শিক্ষার এই ঘাটতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে প্রায় সব চাকরিতেই মৌলিক কম্পিউটার দক্ষতা প্রয়োজন। সরকারি চাকরি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা উদ্যোক্তা—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিগত জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ।

যেসব শিক্ষার্থী স্কুলজীবনে পর্যাপ্ত আইসিটি শিক্ষা পায় না, তাদের পরবর্তীতে অতিরিক্ত কোচিং বা প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক কম্পিউটার ব্যবহারে দুর্বল থাকে। ফলে উচ্চশিক্ষার গবেষণা, প্রোগ্রামিং বা প্রযুক্তিভিত্তিক বিষয়ে তারা পিছিয়ে পড়ে।

আধুনিক আইসিটি শিক্ষার প্রয়োজন:বর্তমান বিশ্বে আইসিটি শিক্ষা শুধু কম্পিউটার চালানো শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে—

ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার সচেতনতা। প্রাথমিক প্রোগ্রামিং ও সমস্যা সমাধান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে ধারণা। ডেটা বিশ্লেষণের মৌলিক বিষয়। ক্লাউড প্রযুক্তি ও অনলাইন সহযোগিতামূলক কাজ। ডিজিটাল নাগরিকত্ব ও তথ্যের নৈতিক ব্যবহার।

এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হলে দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব এবং হালনাগাদ পাঠ্যক্রম প্রয়োজন।

আইসিটি শিক্ষার ঘাটতি দূর করতে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ :

প্রথমত, প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্থায়ী আইসিটি শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে আপডেট থাকতে পারেন।

তৃতীয়ত, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত কম্পিউটার সরবরাহ করতে হবে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৃথক বাজেট রাখতে হবে।

চতুর্থত, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, ব্যবহারিক ক্লাস বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ব্যবহারিক পরীক্ষাকে আরও কার্যকর ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে।

ষষ্ঠত, শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমাতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সপ্তমত, বিদ্যালয় পর্যায়ে কোডিং ক্লাব, রোবটিক্স ক্লাব এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনী কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।

এক যুগেরও বেশি সময় আগে আইসিটি শিক্ষা চালু হলেও এখনও শিক্ষক সংকট, কম্পিউটারের অভাব, অচল ল্যাব, দুর্বল অবকাঠামো এবং ব্যবহারিক শিক্ষার ঘাটতি দেশের প্রযুক্তি শিক্ষাকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেয়নি।

ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে শুধু পাঠ্যবইয়ে আইসিটি অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক প্রযুক্তি, কার্যকর ল্যাব, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থা।

যে শিক্ষার্থী আজ একটি কম্পিউটার ব্যবহার করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।

তাই আইসিটি শিক্ষাকে কেবল একটি বিষয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী নাগরিক গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া গেলে আগামী প্রজন্ম একটি দক্ষ, উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

—-ইন্জি: মো. সিফাত রহমান

সিনিয়র প্রভাষক,মাইলস্টোন কলেজ,তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *